সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ০৪:১৭ অপরাহ্ন

বরিশালের শিলা এখনো কাদে!

রিপোর্ট আজকের বরিশাল:
শিলা বেগম। বাড়ি বরিশাল সিটি করপোরেশনের ২৩ নম্বন ওয়ার্ডে। অভাব অনটনে বেড়ে ওঠা। বিয়ে হয় একই এলাকার রাজমিস্ত্রি খলিলুর রহমানের সঙ্গে। স্বামীর সঙ্গে সুখেই দিন কাটছিল শিলার। তাদের সুখের সংসারে ঘর আলো করে আসে নিপা। কিন্তু এই সুখ বেশিদিন টেকেনি শিলার ভাগ্যে। হঠাৎই শিলা আর নিপাকে ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে যান খলিল। শ্বশুর বাড়ি থেকে শূন্য হাতে বের করে দেওয়া হয় শিলা ও তার মেয়েকে। তাদের বঞ্চিত করা হয় খলিলের সম্পত্তি থেকে।
কোনও উপায় না পেয়ে ২০০৮ সালে মেয়েকে বরিশালে বোনের কাছে রেখে ঢাকায় এসে গার্মেন্টসে কাজ শুরু করেন শিলা। কর্মদক্ষতায় ২০১১ সালে ইথারটেক্স গার্মেন্টসে যোগ দেন সিনিয়র অপারেটর হিসেবে। ফের যেন ভাগ্য ফিরতে শুরু করে শিলার। বেতন বেড়েছে। মেয়ের পড়ালেখাও চলছিল সুন্দরভাবেই। নিপার ভালো রেজাল্টে আশার আলো দেখতে পান শিলা। মেয়েকে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন তার। বেতনের টাকা থেকে কিছু কিছু করে জমাতে থাকেন তিনি। হাজারো স্বপ্ন তখন শিলা ও নিপার চোখে। কিন্তু এক মুহূর্তে সব স্বপ্ন ভেঙে যেন ধুলোয় মিশে যায়। দিনটি ছিল ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল। সাভারের রানা প্লাজায় ইথারটেক্স গার্মেন্টসে কাজ করেছিলেন শিলা। ধসে পড়ে নয় তলা ভবন। ভবনের পিলার এসে পড়ে শিলার ওপর। দীর্ঘ ১৮ ঘণ্টা চাপা পড়ে থাকার পর গুরুতর আহত অবস্থায় বের করা সম্ভব হয় শিলাকে। প্রাণে বাঁচলেও মেরুদন্ড ভেঙে যায় শিলার। কেটে যায় ডান হাতের রগ। তারপর থেকেই পঙ্গু জীবনযাপন করছেন শিলা। ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলেন সব মিলিয়ে ৮৪ হাজার টাকা। কিন্তু এখনও শিলাকে প্রতি মাসে ১৬ হাজার টাকার ওষুধ খেতে হয়। সাভারের আনন্দপুরে এক আত্মীয়ের বাসায় নিয়েছেন আশ্রয়। মানুষের কাছ থেকে সাহায্য হিসেবে যা পান তা দিয়ে কোনো রকমে নিজের ওষুধ আর মেয়ের লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে আসছেন শিলা। নিপা বরিশালের পালরদী মডেল স্কুল থেকে পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ+ পেয়েছে। এবার বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। মেধাবী হওয়া সত্তে¡ও তার লেখাপড়া আজ বন্ধের পথে। কান্নায় ভেঙে পড়েন শিলা বেগম। বলেন, টাকার অভাবে আমার মেয়েটার লেখাপড়া হয়তো আর আমি চালাতে পারবো না। খেয়ে না খেয়ে আমার মেয়ে পরীক্ষা দেয়। সব পরীক্ষায় মেয়ে আমার গোল্ডেন এ+ পেয়েছে। মেয়েটাকে কলেজেও বোধহয় ভর্তি করাতে পারবো না। গত ছয় বছরে কোনো ঈদে সন্তানকে নতুন জামা দিতে পারেননি এই অভাগা মা। বলেন, আমার মেয়েরতো এখন শখ-আহ্লাদ পূরণের বয়স। গত কয়েক বছর ধরে কোনো ঈদে মেয়েটাকে জামা দিতে পারিনি। ছেড়া ফাটা কাপড় পড়ে মেয়েটা আমার স্কুলে যায়। মেয়েটা আমার কাছে আসতে চায়। আমাকে দেখতে চায়। এখানে নিয়ে আসি না। কারণ আমিই বেশিরভাগ দিন এখানে না খেয়ে থাকি। মেয়েটা বোনের কাছে থাকলে তিন বেলা খেতে তো পায়। সন্তানের কথা ভেবে সারাদিন এখন চোখের জলেই ভাসেন শিলা। সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করাই এখন তার স্বপ্ন।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন




© All rights reserved © 2012
Design By MrHostBD