বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ০৩:২২ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
দক্ষিণাঞ্চলে তরুণ তরুণীদের গ্রাস করছে মাদক

দক্ষিণাঞ্চলে তরুণ তরুণীদের গ্রাস করছে মাদক

প্রতিটি বাবা – মায়ের স্বপ্ন থাকে তাদের সন্তান যেন উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে মানুষের মতো মানুষ হয়। দক্ষিণাঞ্চলে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখা তরুণ তরুণীদের আকাঙ্ক্ষার জায়গা এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ব্রজমোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ( বিএম কলেজ) ইত্যাদি। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় এই যে নগরীর প্রায় সকল উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার পরিবেশ দূষিত হচ্ছে মাদকের কড়াল গ্রাসে। সবচেয়ে ভীতিকর ঘটনা এই যে গত কয়েকমাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে আটক হওয়া অনেক মাদক ব্যবসায়ী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোর সরাসরি শিক্ষার্থী। এসব ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক এ এ এম হাফিজুর রহমান বলেন, ” নৈতিক অবক্ষয়, দ্রুত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির লোভ আর কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে অনেক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে যাচ্ছে। মাদক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটগুলো আইনের চোখ ফাঁকি দেবার সহজ উপায় হিসেবে শিক্ষিত ও তুলনামূলক ভদ্র ছেলেমেয়েদের এই পেশায় যুক্ত করার চেষ্টা করছে। ”

গত দুই মাসের স্থানীয় গণমাধ্যম গুলো লক্ষ করলে দেখা যায় বরিশাল শহরের নামকরা অনেক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত শিক্ষার্থী আটকের ঘটনা ঘটেছে। গত জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ ফ্যাকাল্টির শিক্ষার্থী আরাফাত ইসলামকে বড় মাপের মাদকের চালানসহ আটক করে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী। তার কাছ থেকে ষোলো জয়েন্ট (স্টিক) গাঁজা ও কুড়ি পিস ইয়াবা পাওয়া যায়। অনুসন্ধানে জানা যায় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদক ব্যবসার একক নিয়ন্ত্রণ ছিল পলাশপুর বস্তি নিবাসী কাবিলা নামধারী একজন ব্যাক্তির। পরবর্তীতে সে পটুয়াখালীর আলোচিত নয়ন বন্ডের মাধ্যমে ঢাকা মুখি মাদক বাণিজ্য শুরু করলে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ব্যবসা শুরু করে গোলাম রাব্বি নামের একজন। সে নিজেকে ২৪ নং ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনারের আত্নীয় ও ওয়ার্ড ছাত্রলীগ নেতা পরিচয় দিতো। কিন্তু ২৪ নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগ ও সাবেক কমিশনার ফিরোজ আহমেদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী রাব্বির এসব পরিচয় ভিত্তিহীন। ফিরোজ আহমেদ এর গোলাম রাব্বি নামের কোন আত্মীয় নেই এবং ২৪ নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে এই নামে কারো পদ নেই। গোলাম রাব্বির মাধ্যমেই মাদক ব্যবসায় জড়িত হয় ববি শিক্ষার্থী আরাফাত ইসলাম। তবে এখন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মাদক ব্যবসায় কারো একক আধিপত্য নেই। আরাফাত সহ আরো কিছু ছোট ছোট গ্রুপ সক্রিয় যাদেরকে সহায়তা করে বিশ্ববিদ্যালয় পার্শবর্তী থানা ও ওয়ার্ডের কথিত কিছু রাজনৈতিক নেতা।

অন্যদিকে শের ই বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় এর আওতাধীন আইএইচটির ৩০৯ নং কক্ষ থেকে গত ২২ জুন মাদক সেবনরত অবস্থায় নাসিম খন্দকার (২২), নাইম (১৮), সবুজ (১৯) এবং ফরিদ (১৯)কে আটক করে পুলিশ। তারা সবাই সরকার দলীয় ছাত্রনেতা ও আইএইচটির শিক্ষার্থী আফাজ উদ্দিনের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা ও সেবনে জড়িত। আফাজ উদ্দিন গত ১৯ শে আগস্ট আইএইচটির উপাধাক্ষ ডাঃ শুভঙ্কর বাড়ৈ কে পরিবহনকারী বাইকে গোপনে ইয়াবা ঢুকিয়ে হেনস্তা করার চেষ্টা করে এমন খবর স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত হয়েছিল। অনুসন্ধানে জানা যায় আইএইচটি ছাত্রলীগের কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করে নগরীর চাঁদমারি নিবাসী আরিফুর রহমান শাকিল। বিএম কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী শাকিল নিজেকে মহানগর ছাত্রলীগ নেতা পরিচয় দিলেও নগর ছাত্রলীগের কমিটিতে তার কোন পদ – পদবি নেই। এছাড়া শের ই বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় এর নির্মিতব্য নতুন বিল্ডিং (পরমাণুর পাশে), কলেজ ভবনের পিছনের রাস্তা ( জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক কার্যালয়ের পাশের রাস্তা) এবং ইন্টার্ন হোস্টেলের সামনের রাস্তায় প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যার পর মাদক সেবন চলে। জনমানুষের আনাগোনা কম হওয়ায় ওখানকার মাদকবিক্রেতা ও মাদকসেবিদের কাছে জায়গাগুলো নিরাপদ স্পট হিসেবে পরিচিত।

এদিকে সরকারি ব্রজমোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ (বিএম কলেজ) এর মুক্ত মঞ্চের পিছনে ও বাকসুর ছাদে নিয়মিত মাদকের আড্ডা বসে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএম কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী এসব তথ্যের নিশ্চয়তা দিয়ে আরো বলেন মাদকবিক্রেতাদের একটি গ্রুপ সেখানকার বনমালী গাঙ্গুলি ছাত্রীনিবাসেও বিভিন্ন ধরণের মাদক বিক্রির জন্য সংরক্ষণ করে। গতবছর ফারজানা আক্তার নামে এক বিএম কলেজ শিক্ষার্থীর মাদক ব্যবসার খবর গণমাধ্যমে আসলে মাদক ব্যবসার স্পট হিসেবে ওই ছাত্রীনিবাসের খবর প্রথম চাউর হয়। কদিন আগে বরিশাল শহরের চিহ্নিত মাদক বিক্রেতা শাফায়াত খান শাওন ওরফে জং শাওনকে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। একই সাথে শাওনের সহযোগী বিএম কলেজ শিক্ষার্থী আল আমিনকে গ্রেপ্তার করা হয়।গত ১৫ই আগস্ট বৃহস্পতিবার বিকেলে শহরের ব্রাউন কম্পাউন্ড এলাকায় অভিযান চালিয়ে ডিবি পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) দেলোয়ার হোসেন তাদের গ্রেপ্তার করেন।এই ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা করা হয়। পরবর্তীতে সেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাদেরকে পরদিন শুক্রবার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে- এই শাওন বরিশাল জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রাজিব খানের সহযোগী। বিভিন্ন সময়ে দলীয় অনেক কর্মসূচিতে তাকে রাজিবের কাছাকাছি থাকতে দেখা গেছে। তবে শাওন আগে বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। ২০১৫ সালে তিনি রাজিবের হাত ধরে ছাত্রলীগে প্রবেশ করেন। সম্প্রতি ছাত্রলীগের খোলশ পড়ে শাওন সরকারি বরিশাল কলেজ ও বিএম কলেজ ক্যাম্পাসে মাদক ব্যবসা শুরু করার পায়তারা করে। সেখানে আগে থেকেই মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া অন্য গ্রুপের কেউ সোর্স হিসেবে পুলিশকে খবর দিয়ে শাওনকে ধরিয়েছে এমন ধারণা অনেকের।

উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হবার পিছনে সামাজিক অস্থিরতা ও আকাশ সংস্কৃতি থেকে প্রাপ্ত অনৈতিক জীবন যাপনের অভ্যাসকে দায়ী করেন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও চিকিৎসক ডাঃ শিরিন সাবিহা তন্বী। তিনি বলেন, ” নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা থেকে বর্তমান তরুণ প্রজন্ম যে দূরে সরে যাচ্ছে এই খবর সেটারই প্রমাণ। এ অবস্থায় অভিভাবক, শিক্ষকমণ্ডলী, প্রশাসন সবাইকে একসঙ্গে যুবসম্প্রদায়ের মানবিক উন্নয়ন বিষয়ে কাজ করতে হবে। ” তবে এদেরকে কঠিন শাস্তির আওতায় এনে উদাহরণ সৃষ্টি করার পরামর্শ দিয়েছেন বরিশালের বিশিষ্ট নাগরিক ও সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী জহিরুল ইসলাম (জেড আই) খান পান্না। তিনি বলেন, ” মাদক ব্যবসার মাধ্যমে পুরো সমাজের ক্ষতি করে তারা কুশিক্ষা অর্জনটাকেই প্রশারিত করছে। তারা কতটুকু উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করলো তার থেকেও বড় ব্যাপার কতটুকু সুশিক্ষা গ্রহণ করেছে। যেকোনো অপকর্মে অংশ নেওয়া মানুষকে আইনের আওতায় এনে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ভালো আর খারাপের মধ্যকার পার্থক্য সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে। ”
বর্তমান প্রেক্ষাপট থেকে উত্তরণে প্রশাসনের ভুমিকা কি এমন প্রশ্নের জবাবে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক এ এ এম হাফিজুর রহমান জানান, ” আমরা প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিতভাবে মাদকবিরোধী জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করার কথা ভাবছি। এর সাথে সাথে সাইন্টিফিক ট্রাকিং ডিভাইস বরিশালে ইনস্টল করবো যার মাধ্যমে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের তৎপরতার ওপর নজর রাখা যায়। ” এছাড়াও তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে ভবিষ্যতে আরো বেশি অভিযান পরিচালনার কথা জানান।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন




© All rights reserved © 2012
Design By MrHostBD