শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:৪৫ পূর্বাহ্ন
তিনি বলেছেন, আমি দেশবাসীকে পবিত্র মাহে রমজানের শুভেচ্ছা জানাই। রমজান আত্মশুদ্ধির মাস। আমরা যদি আত্মশুদ্ধি শব্দটির মর্মার্থ উপলব্ধি করি, তাহলে এই মাসে মানুষের ভোগান্তি বাড়ার কথা নয়।
ভাষণের শুরুতেই মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের সময়কালের দুর্নীতি, দুঃশাসনে পর্যুদস্ত একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল শাসন কাঠামো এবং অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মনে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই হচ্ছে আমাদের সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
‘আগামীকাল থেকেই সারাদেশে শুরু হতে যাচ্ছে পবিত্র মাহে রমজান। আমি দেশবাসীকে পবিত্র মাহে রমজানের শুভেচ্ছা জানাই। রমজান আত্মশুদ্ধির মাস। আমরা যদি আত্মশুদ্ধি শব্দটির মর্মার্থ উপলব্ধি করি তাহলে এই মাসে মানুষের ভোগান্তি বাড়ার কথা নয়। যদিও আমাদের অনেকের মধ্যেই এই মাসকে ঘিরে ব্যবসায় অধিক মুনাফা লাভের প্রবণতা লক্ষণীয়। আপনাদের প্রতি আমার আহ্বান, রমজানের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে এই মাসকে আপনারা ব্যবসায় মুনাফা লাভের মাস হিসেবে বিবেচনা করবেন না।’
দ্রব্যমূল্য যাতে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে না যায়, এ ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, হাজারো প্রাণের বিনিময়ে একটি মাফিয়া সিন্ডিকেটের পতন ঘটিয়ে, রাষ্ট্র এবং সরকারের জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে আমরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। বিএনপি সরকার সকল ক্ষেত্রেই অনাচার ও অনিয়মের সকল সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে বদ্ধপরিকর। ইনশাআল্লাহ।
ক্ষুদ্র, মাঝারি কিংবা ছোট-বড়, সব ব্যবসায়ীদের প্রতি বর্তমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি সহজ এবং স্পষ্ট উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ব্যবসায়ী এবং ক্রেতা সাধারণ উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চায়। সুতরাং, সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করলে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের স্বার্থ রক্ষা হবে, এ ব্যাপারে আপনার যে কোনো ধরনের পরামর্শ কিংবা অভিযোগ শোনা হবে। ক্রেতা-বিক্রেতা গ্রহীতা, এই সরকার সকলেরই সরকার। এই সরকার আপনাদেরই সরকার। আপনারা ভোটের মাধ্যমে এই সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছেন। আপনারাই এই সরকারের শক্তি।
‘রমজান মাসে রোজাদারগণ বিশেষ করে ইফতার, তারাবিহ, সেহরি এই সময়গুলোতে নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পেতে চান। এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে এরইমধ্যে আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছি। অপচয় রোধ করে কৃচ্ছ্রসাধন প্রতিটি মুসলমানের ঈমানী দায়িত্ব। অফিস-আদালতে বিনা প্রয়োজনে কিংবা প্রয়োজনের অতিরিক্ত গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি খরচের ব্যাপারে সচেতনতা অবলম্বন করাও ইবাদাতের অংশ।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সকল সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং জনসাধারণের প্রতি কৃচ্ছ্রসাধনের আহ্বান জানানোর আগে আমি সরকারের মন্ত্রী এবং বিএনপির এমপিদেরকে দিয়েই একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চেয়েছি। বিএনপির সংসদীয় দলের প্রথম সভাতেই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিএনপি থেকে নির্বাচিত কোনো এমপি সরকারি সুবিধা নিয়ে ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি আমদানি করবেন না এবং প্লট সুবিধা নেবেন না। আমি আপনাদের সামনে বলেছিলাম, রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে বিএনপি সরকার মহানবীর ‘ন্যায়পরায়ণতার’ আদর্শ অনুসরণ করবে। আমি মনে করি, বিএনপির সংসদীয় দলের এইসব সিদ্ধান্ত ‘ন্যায়পরায়ণতার’ আদর্শেরই প্রতিফলন।
বিভাগীয় শহরগুলোয়, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় যানজট প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন উল্লেখ করে তিনি বলেন, হাটে-মাঠে, ঘাটে, অফিস-আদালতে জনগণের ভোগান্তির শেষ নেই। জনজীবনের নানা ক্ষেত্রে জনদুর্ভোগ লাঘব করা না গেলে জনমনে স্বস্তি ফিরবে না। রাজধানীতে জনসংখ্যার চাপ কমাতে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। মানুষ তার নিজ জেলায় কিংবা নিজের বাসায় থেকেও যাতে সহজভাবে, সঠিক সময়ে অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারেন, সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই সারাদেশে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রথমেই রেল, নৌ, সড়ক এবং সেতু মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস ও সমন্বয় করা হচ্ছে। আমরা মনে করি, সারাদেশে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ, সুলভ এবং নিরাপদ করা গেলে, একদিকে যেমন জনগণের শহর-নগরকেন্দ্রিক নির্ভরতা কমবে, অপরদিকে পরিবেশেরও উন্নতি হবে।
তারেক রহমান বলেন, আমাদের চারপাশে সমস্যার শেষ নেই। তবে সমস্যার পাশাপাশি সম্ভাবনাও কম নয়। আমাদের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে যদি আমরা দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারি, তাহলে এই জনসংখ্যাই হবে আমাদের ‘জনসম্পদ’। আমরা নিজেদেরকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারলে, শুধু বাংলাদেশই নয়, বিশ্ব বাজারও আমাদের জন্য উন্মুক্ত। তথ্য প্রযুক্তির সিঁড়ি বেয়ে বিশ্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছে। প্রযুক্তির এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সম্মান এবং সচ্ছলতার সঙ্গে টিকে থাকতে হলে আমাদের কোনো না কোনো ক্ষেত্রে পারদর্শী হতে হবে।
‘দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থী এবং তরুণ যুবশক্তির উদ্দেশে বলতে চাই, মেধা, জ্ঞান ও বিজ্ঞানে নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য যতরকম সহযোগিতা করা যায়, সবরকম সহযোগিতা দিতে বর্তমান সরকার প্রস্তুত। কর্মসংস্থান এবং কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার নিয়ে বর্তমান সরকার যাত্রা শুরু করেছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর পর দেশে ফিরে, গত বছরে ২৫ ডিসেম্বর আমি বলেছিলাম, দেশ এবং জনগণের জন্য ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে আমার ‘প্ল্যান’ পরিকল্পনার অনেক কিছুই আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরেছিলাম। আপনারা স্বাধীনতার ঘোষকের প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপিকে ভোট দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছেন। সকল পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ দিয়েছেন। এখন এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সকল অঙ্গীকার পূরণের দায়িত্ব বিএনপি সরকারের। আমরা আমাদের পরিকল্পনা এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে দিয়েছি, ইনশাআল্লাহ। অঙ্গীকার পূরণের এই যাত্রাপথে আমরা ভবিষ্যতের দিনগুলোতেও আপনাদের অব্যাহত সমর্থন প্রত্যাশা করি।
সরকারপ্রধান হিসেবে দেশবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, নবগঠিত সরকার গঠনের সুযোগ দিতে যারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন কিংবা দেননি, অথবা কাউকেই ভোট দেননি, এই সরকারের প্রতি আপনাদের সবার অধিকার সমান। বিএনপি সরকার বিশ্বাস করে, দলমত, ধর্ম, দর্শন যার যার, রাষ্ট্র সবার। এই দেশে, এই রাষ্ট্রে একজন বাংলাদেশি হিসেবে, আপনার, আমার, আমাদের প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকের অধিকার সমান।
‘আল্লাহ আমাদের সবাইকে নিরাপদ এবং সুস্থ রাখুন। আল্লাহ আমাদেরকে সকল ইতিবাচক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের তৌফিক দিন। পবিত্র রোজার মাস শুরুর শুভলগ্নে আল্লাহর দরবারে এ-ই নিবেদন’, যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।