বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:৩৩ পূর্বাহ্ন
জামায়াতে ইসলমীর দিকে ইঙ্গিত করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, একটি দলের দাবি বিএনপি নাকি দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন ছিল। আমার প্রশ্ন হলো—২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারে ওই দলটিরও দুইজন সদস্য (মন্ত্রী) ছিলেন। বিএনপি যদি এতই খারাপ হতো, তবে তারা কেন তখন পদত্যাগ করে চলে আসেননি?
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) বিকেলে ময়মনসিংহ নগরীর সার্কিট হাউস মাঠে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বিভাগীয় জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, আমরা রাজনীতি করি, আমরা বাংলাদেশের মানুষের জন্য রাজনীতি করি।
তারেক রহমান উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে আরও বলেন, আপনারা পত্রিকায় দেখেছেন একটি রাজনৈতিক দল, যারা এখন পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচারের মুখের ভাষা ব্যবহার করে বিএনপির বিরুদ্ধে কথা বলছে। তাদের দাবি, বিএনপি নাকি দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন ছিল।
জনসভায় ময়মনসিংহ অঞ্চলের মৎস্য চাষের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আমি ময়মনসিংহের মৎস্য চাষিদের কথা বলেছি, একটু হলেও যেন তারা সুবিধা পায়। শুধু মৎস্য চাষিদের জন্য নয়, কৃষকদের কৃষি কার্ডের ব্যবস্থা করা হবে। কৃষি কার্ড দেওয়ার একমাত্র কারণ—কৃষক ভালো থাকলে বাংলাদেশের মানুষ ভালো থাকবে। আমরা কৃষক ভাইদের সহযোগিতা করতে চাই, কৃষক ভাইদের পাশে থাকতে চাই। কৃষি কার্ডের মাধ্যমে যেন আমরা প্রয়োজনীয় সার ও কীটনাশক দিতে পারি।
ময়মনসিংহ বিভাগের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, আমি জানি ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা, জামালপুর অঞ্চলগুলোতে ব্যাপক সমস্যা রয়েছে। নদীভাঙন সমস্যা, কর্মসংস্থান সমস্যা, জেলাগুলোর বিভিন্ন উপজেলায় সেতু, স্কুল, কলেজ, রাস্তাঘাট—এগুলোর সমস্যা রয়ে গেছে। যেগুলোর গত এক যুগে সংস্কার, মেরামত, তৈরির প্রয়োজন ছিল। যা বিগত সরকার করেনি। এই সমস্যাগুলো সমাধান হওয়ার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু হয়নি। কারণ জনগণের ভোটের অধিকার ছিল না। নিশিরাতের নির্বাচন হয়েছিল তথাকথিত নির্বাচন। যেখানে সত্যিকারের জনপ্রতিনিধি ছিল না। তাই দেশের যুবকদের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়নি। তাই এলাকার মা-বোনদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি।
তিনি বলেন, আজ আমরা সবাই একত্রিত হয়েছি। এই দেশের মানুষ, তাদের যে অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল, যে অধিকারের জন্য গত ১৬ বছর গুম, খুন, অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যে অধিকারের জন্য ২০২৪ সালে জুলাই-আগস্টে হাজারো মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।
হাজার হাজার মানুষকে আহত করা হয়েছে, সেই অধিকার আগামী মাসের ১২ তারিখে প্রয়োগ করতে যাচ্ছে ইনশা-আল্লাহ। কী সেই অধিকার? ভোটের অধিকার। কেন এই ভোটের অধিকার দরকার? কারণ আমরা চাই এই দেশের মালিক যে জনগণ, তাদের সেই অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। যাতে জনতার ইচ্ছামতো সামনে চলতে পারে। সেই ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানোর জন্যই ভোটের অধিকার। মানুষের কথা বলার অধিকার, মানুষের ন্যায্য অধিকার যাতে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে—এ জন্যই দরকার ভোটের অধিকার। তিনি আরও বলেন, বিগত সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সঠিকভাবে শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। উপজেলা হাসপাতাল বলুন বা জেলা হাসপাতালই বলুন, যে ওষুধ, চিকিৎসা ও চিকিৎসক দেওয়ার কথা, তা দেওয়া হয়নি। যে কারণে গ্রামগঞ্জের মানুষ সঠিক চিকিৎসা পায়নি। বাংলাদেশের মানুষ একজন অভিভাবক চায় এবং তাদের সন্তান যেন সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়। একজন অভিভাবক চায়, তার সন্তান যেন সেই শিক্ষা পায়, যে শিক্ষা গ্রহণ করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবে, বেকার থাকবে না।
এ সময় যুবসমাজের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, তরুণরা, যুবকরা কী চায়? তারা চায় দেশে কর্মসংস্থান হবে। দেশে মিল-ফ্যাক্টরি হবে, ব্যবসা-বাণিজ্য হবে, যাতে করে সুন্দরভাবে নিরাপদে ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকরি করতে পারবে। মানুষ অসুস্থ হতেই পারে, হওয়াটাই স্বাভাবিক, অসুস্থ হলে যেন মানুষ চিকিৎসা পায়। আমরা যদি ময়মনসিংহের কথা বলি, এখানকার কৃষক ভাইদের অনেক সমস্যা রয়েছে। বিশেষ করে মাছের পোনা চাষ। এটি আরও বড় করে করা যেত, কিন্তু তা করা হয়নি। এগুলো আমাদের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে—কিভাবে এই মাছের পোনা চাষ করে দেশ ও বাইরে পাঠানো সম্ভব হয়।
জনসভায় মাদক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা জানি ময়মনসিংহ বিভাগের নেত্রকোনা, শেরপুরে ব্যাপক মাদক সমস্যা রয়েছে। কিন্তু মাদক সমস্যা সমাধান কীভাবে করবেন? মাদক সমস্যা দূর করতে হলে তরুণ-যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। মানুষ যখন কাজে থাকবে তখন মানুষ এগুলোতে যাবে না। আমরা সেই পরিবেশ করতে চাই।
তরুণদের আইটি প্রশিক্ষণ বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, আমরা দেশে আইটি ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করব। যেখানে তরুণরা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে। যারা আইটিতে কাজ করে তাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের আইটি ট্রেনিংয়ের পরিকল্পনা করছি। যাতে তারা আইটিতে কাজ করে ঘরে বসে আয়-রোজগার করতে পারে।
এ সময় খাল খনন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ময়মনসিংহ অন্যতম কৃষিপ্রধান এলাকা, এখানে এক সময় অনেক খাল-বিল ছিল। এখন এই খাল-বিলগুলো সব ভরাট হয়ে গেছে। এগুলো আমরা পুনঃখনন করতে চাই। এখন এসব খাল-বিল পুনঃখননের জন্য কে কে কোদাল হাতে নেবেন? আগামী ১২ তারিখের পর আমি আপনাদের কোদাল হাতে নিয়ে আসতে বলবো, আমি কিন্তু থাকবো আপনাদের সঙ্গে। এই দেশের মঙ্গলের স্বার্থে আপনাদের সামনে কতগুলো কথা বললাম। এই কাজগুলো বাস্তবায়ন করতে কম-বেশি সক্ষম হওয়ার জন্য আগামী ১২ তারিখে ধানের শীষে ভোট দিতে হবে। তাহলে আমরা সফল হবো ইনশা-আল্লাহ।
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও ময়মনসিংহ-৫ (মুক্তাগাছা) আসনের প্রার্থী জাকির হোসেন বাবলু। সভাটি যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনের প্রার্থী আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ, জেলা উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা) আসনের প্রার্থী মোতাহার হোসেন তালুকদার এবং দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব রোকনুজ্জামান সরকার রোকন।
এ সময় মঞ্চে আরও উপস্থিত ছিলেন তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমান, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) আসনের প্রার্থী সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক (বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত) মো. শরীফুল আলম, কোষাধ্যক্ষ রাশিদুজ্জামান মিল্লাত, বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক শাহ ওয়ারেস আলী মামুন, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, আমরা বিএনপি পরিবারের আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমন, ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর) আসনের প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ইকবাল হোসাইন, ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়ীয়া) আসনের প্রার্থী আকতারুল আলম ফারুক, ময়মনসিংহ-৭ আসনের ডা. মাহাবুবুর রহমান লিটন, ঈশ্বরগঞ্জ আসনের লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু, নান্দাইলের প্রার্থী ইয়াসের খান চৌধুরী, গফরগাঁওয়ের প্রার্থী আখতারুজ্জামান বাচ্চু, ভালুকা আসনের প্রার্থী ফখরুদ্দিন আহমেদ বাচ্চুসহ ময়মনসিংহ বিভাগের ৪ জেলার (ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর এবং নেত্রকোনা) ২৪টি সংসদীয় আসনের দলীয় প্রার্থীরা। এছাড়াও মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক একেএম শফিকুল ইসলাম, বিএনপি নেতা আফজাল এইচ খান, ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আলমগীর মাহমুদ আলম, মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক শেখ আমজাদ আলী, একেএম মাহাবুবুল আলম, শামীম আজাদ, দক্ষিণ জেলার যুগ্ম আহ্বায়ক শহীদুল আমিন খসরুসহ বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
দুপুর আড়াইটায় জনসভা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তারেক রহমান মঞ্চে আসেন বেলা ৪টা ৩ মিনিটের দিকে। তবে মঞ্চে ওঠার আগে তিনি সমাবেশস্থলের পাশে উপস্থিত থাকা স্বৈরাচারবিরোধী এবং জুলাই আন্দোলনে আহত ও শহীদদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে কুশল বিনিময় করেন। পরে তিনি মঞ্চে উঠে উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এরপর টানা ২৬ মিনিট জনসভায় বক্তব্য রাখেন।